পুরানো মাস্কের গল্প

মাস্ক গুলো বহুল ব্যবহারে জীর্ণ। জীর্ণ ঠিক বলা যায় না। বাইরে থেকে দেখতে বেজায় লাগে। তবে পরলেই সকালের বাসি মুখের গন্ধ আর ঘামের বদবু মিশিয়ে বিচ্ছিরি একটা গন্ধ নাকে লেগে থাকে। ইচ্ছে করে না পরতে।

১)

বন্ধু ফোন করেছে। অনেক গুলো দিন পরে।

ভারী ভেঙে পড়েছে বেচারা। সায়ন্তনী নাকি ওকে ডিচ করছে। চুপচাপ শুনে গেলাম। মাঝখানে ড্রয়ারটা টেনে নিয়ে দেখলাম কোন মাস্কটা পরা যায়। সহানুভূতি-মাস্ক? ‘ছাড় তো এসব। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ নাকি সুপরামর্শ মাস্ক? ‘এবার বেরিয়ে আয়। ওরকম একটা মানুষকে নিয়ে তুই সারা জীবন…’ – মাস্কের ওপরে লেখাটা পুরোটা পড়তে ইচ্ছে করলো না। মনে হল একটা সম্পর্কে কত গুলো যে লেয়ার থাকে। দুজনকেই অনেকদিন ধরে দেখেছি। সাদা কালো তুলি দিয়ে সব ছবি আঁকা যায় না।

আমার নীরবতা দেখেই হয়তো হবে, হঠাত ওপাশের কণ্ঠস্বর ব্রেক নিলো।  ছাড় এসব, আমার কথাই বলে যাচ্ছি। তোর কি খবর বল?

আমি জানি, আমার নির্লিপ্তি ওকে আঘাত দিয়েছে। হয়তো ভাবছে মুম্বাই গিয়ে পাল্টে গেছে বন্ধু। আমি তখন ভাবছি, যে মানুষটা উত্তেজনায় আবেগে আরেকটু  হলেই কেঁদে ফেলছিল, সে হঠাত কি অবলীলায় প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিলো। তবে কি সবটাই অভিনয়? তাহলে কোনটা অভিনয়? একটু আগের কষ্ট মাখা প্রেমিকার প্রতি রাগ অভিমান আর খিস্তি গুলো? নাকি এখনের এই ছাড়-আমার কথা,-তোর-খবর-বল – টা?  পরিস্থিতি বুঝে মানুষ কি অবলীলায় মুখোশ বদলে নেয় এক নিমেষে। এটাকেই হয়তো বড় হওয়া বলে।

তাহলে কোনটা অভিনয়? একটু আগের কষ্ট মাখা প্রেমিকার প্রতি রাগ অভিমান আর খিস্তি গুলো? নাকি এখনের এই ছাড়-আমার কথা,-তোর-খবর-বল – টা?

আমার তখন বলা উচিত ছিল, ‘না রে, তোদের কথাই ভাবছি। খুব খারাপ লাগে এখন শুনলে। সেই ছয় বছরের সম্পর্ক, মনে পড়ে …’ না, নস্টালজিয়া মাস্ক টাতেও বড্ড বাসি গন্ধ।

এক সময়ে ওপাশ থেকে ফোন কেটে যায়। ‘চল, নেটওয়ার্ক প্রব্লেম করছে, এখন রাখি বুঝলি। ‘

২)

দেখলাম হোয়াটসআপে অনেক গুলো ম্যাসেজের নোটিফিকেশন। প্রেমিকার নতুন লিপস্টিক আমাজন আজ ডেলিভারি দিয়েছে। তারই ট্রায়াল চলছে – মেসেজ বক্সে অনেক গুলো সেলফি। আমায় কেমন লাগছে?

ওকে আমার সবচেয়ে দেখতে ভালো লাগে যখন সাত সকালে উঠেই সেলফি দেয়। অবিন্যস্ত চুল, ফোলা ফোলা চোখ – দেখে ভারী আপনার মনে হয়। কিন্তু দুপুরের অস্নাত এলোমেলো চুল, বিন্দু বিন্দু ঘাম, মেক আপ হীন মুখে দুম করে তীব্র লালে রাঙ্গানো একটা ঠোঁট দেখে কি বলব বুঝতে পারলাম না।

ড্রয়ারটা টেনে নিয়ে মুখোশ গুলো খুঁজতে লাগলাম। একটাতে লেখা, ‘ও মা, কি দারুণ লাগছে। কবে কিনলি? মুহা মুহা।’ আরেকটা নতুন আনানো। তাতে লেখা, ‘ভালই লাগছে। তবে তোর ওই আগের হালকা গোলাপি শেডটা বেশি ভালো লাগে আমার। ‘  সম্পর্কের একটা পর্যায় পর এই দ্বিতীয় মাস্কটা কিনে রাখতে হয়। আগের মত একই প্রশংসা করলে ও ধরে নেয়, আমি ভালো করে ওকে দেখলামই না।

সম্পর্কের একটা পর্যায় পর এই দ্বিতীয় মাস্কটা কিনে রাখতে হয়। আগের মত একই প্রশংসা করলে ও ধরে নেয়, আমি ভালো করে ওকে দেখলামই না।

যাই হোক। এখন আর মুড নেই। ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলাম। মেসেজটা সিন হয়ে থাকল।

৩)

স্নান করে খেয়ে দেয়ে একটা মুভি দেখলাম। তারপর ঘুমাতে ঘুমাতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে খেয়াল করিনি।

ঘুমটা ভাঙল মার ফোন পেয়ে।

আজকে আবার এক চোট হয়ে গেছে পাশের বাড়ির মিতুন জেঠির সঙ্গে। আবার ড্রয়ারটার দিকে হাত বাড়িয়েও থমকে গেলাম। আর বলতে ইচ্ছে করলো না, ‘বলতে পারলে না, আগে নিজের ঘর সামলাতে, তারপর ঝগড়া করতে আসতে?… ‘  ও বাড়ির ছাদের জল পাঁচিলের এ পাশে পড়ে কিনা, এ বাড়ির নারকেল গাছের কটা পাতা ওদের দিকে – এই সবের বাইরেও মস্ত বড় একটা পৃথিবী আছে। সে কথাটা কখনও বলে উঠতে পারি নি। দূরে থেকেও ছেলে যে তোমার বেদনা আজও বুঝতে পারে – সেটা প্রমাণ করতে মাস্কটা পরে নিতেই হয়।

ও বাড়ির ছাদের জল পাঁচিলের এ পাশে পড়ে কিনা, এ বাড়ির নারকেল গাছের কটা পাতা ওদের দিকে – এই সবের বাইরেও মস্ত বড় একটা পৃথিবী আছে। সে কথাটা কখনও বলে উঠতে পারি নি।

জানি না শুধু আমারই এমন করে মনে হয় কিনা। হয়তো বাকি লোকেদের স্বাভাবিক আবেগ গুলো দিব্যি আসে – স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। কলিগের সাফল্যে ‘কনগ্রাচুলেশন’ , বন্ধুর সাফল্যে, ‘ওরেব্বাস, ফাটিয়ে দিয়েছ তো গুরু, এবার খাওয়া’ -গুলো যেন আসে না সহজে। ওদেরকে ভালবাসি না এমন নয়। ওদের ভালো থাকায় ভালই লাগে, খারাপ থাকা শুনলে বিষণ্ণ হয় মন। কিন্তু সেটাকে কিছুতেই ভাষাতে রূপ দিতে পারি না। চুপ করে যাই। বলতে গেলেই মনে হয়, এই বুঝি পকেটে রাখা মাস্কের দিকে হাত বাড়িয়ে ফেললাম।

এত গুলো মাস্ক বয়ে বেড়াতে ক্লান্তি লাগে। তুমিও যদি কখনও মাস্কের আড়ালে এই সাদা মেক আপ বিহীন মুখটা দেখে ফেল, বিশ্রী মনে হলেও ক্ষমা করে দিও।

Leave a Reply

Scroll to Top