কেমন আছো, বাতি?
আমি মন্দ না।
জানোই তো, মাঝে মাঝে নির্জীব ঝরা পাতার মতো
লেপটে থাকি বিছানা জুড়ে।
আমার কোঁকড়ানো শরীরটার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে
আমার হাজার ডলারের এক চিলতে জানালা।
তার ঝুলিতে এক পেল্লায় পুরোনো ইটের দেওয়ালের ইমারত,
ঘুণ ধরা কালো রঙের ফায়ার এসকেপ,
ইমারতের উপর দিয়ে এক চিলতে ধূসর আকাশ—
যেন কেউ খুব কৃপণ হাতে
দিনটাকে মেপে মেপে দিয়েছে।
তুমি কোথায় এখন, বাতি?
তোমার জানালায় কী আটলান্টিকের টলটলে নীল জল?
নাকি নিশ্চিন্দিপুরের শ্যাওলা-গোলা সবুজ জল?
নাকি কোনো জলই নেই—
শুধু দূরের কোনো পাখির ডানা ভেঙে যাওয়া বিকেল,
আর তারও ওপরে
নরম হলুদ আলোয় ভিজে থাকা একফালি চুপচাপ?
এখানে সন্ধ্যা নামে খুব ধীরে,
যেন ক্লান্ত নার্সের পায়ের শব্দ
করিডোর পেরিয়ে আসে,
তারপর দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
আজও কি জেগে থাকবে?
আমি উত্তর দিই না।
শুধু বালিশের পাশে উলটে রাখা ফোনটায়
তোমার নাম না-জ্বলা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি।
কত নাম জ্বলে, কত সংবাদ, কত কাজ, কত অনর্থক তাড়া—
তবু একটিমাত্র সম্বোধনের জন্য
মন কেমন করে ওঠে:
“কেমন আছো?”
তুমি জানো, বাতি,
মানুষ আসলে কত কম জিনিসে বেঁচে থাকে?
একটু জায়গা,
একটু অভ্যাস,
একটু জল,
আর দূরের কারও কণ্ঠস্বরের সম্ভাবনা।
বাকি সবই বড়ো সাজানো—
এই শহরের উঁচু বাড়ি,
মুদ্রার জোরে কেনা জানালা,
শীত আটকানো দেয়াল,
লিফটের আয়নায় প্রতিদিন নতুন করে চিনে নেওয়া মুখ।
ভেতরে ভেতরে আমরা সবাই
কোনো-না-কোনো পুরোনো উঠোনে ফিরে যেতে চাই,
যেখানে বিকেলের রোদে
ধুলোও আপন মনে ঝলমল করত।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি,
যদি হঠাৎ তোমার কাছে ফিরে যাই,
চেনা যাবে তো?
এই যে এত শীত, এত বিদেশ, এত না-বলা কথা
জমে জমে আমার গলায় অন্যরকম আওয়াজ বসিয়েছে—
তার মধ্যে কি আগের সেই আমিটুকু
এখনও বেঁচে আছে?
তুমি ভালো থেকো, বাতি।
তোমার জানালায় যদি সত্যিই জল থাকে,
তবে তার দিকে আমার হয়ে একবার তাকিও।
আর যদি কেবল ইটের দেওয়ালই থাকে,
তবু তাকিও—
কারণ সব দেওয়ালই একরকম নয়,
কিছু কিছু দেওয়ালের গায়েও
ফিরে যাওয়ার ছায়া লেগে থাকে।
আমি এদিকে মন্দ না।
জানোই তো, মাঝে মাঝে নির্জীব ঝরা পাতার মতো
লেপটে থাকি বিছানা জুড়ে।
তবু তার মধ্যেও
খুব গোপনে, খুব আস্তে,
একটা আলো জ্বলে—
তোমাকে ডেকে ওঠে,
কেমন আছো, বাতি?
